সাত সমুদ্রের ওপারে: শিক্ষার্থী অভিবাসন ইস্যুতে সিলেটে সাংবাদিকদের মতবিনিময় সভা

সাত সমুদ্রের ওপারে: শিক্ষার্থী অভিবাসন ইস্যুতে সিলেটে সাংবাদিকদের মতবিনিময় সভা

সুবর্ণা হামিদ 

 সিলেটে শিক্ষার্থী অভিবাসন সংক্রান্ত ভুল তথ্য, প্রতারণা ও ঝুঁকি মোকাবিলায় সাংবাদিকদের ভূমিকা শক্তিশালী করার লক্ষ্যে একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

সেন্টার ফর কমিউনিকেশন অ্যাকশন বাংলাদেশ (সি-ক্যাব)-এর উদ্যোগে আয়োজিত এই সেশনের শিরোনাম ছিল সাত সমুদ্রের ওপারেঃ সিলেটে অভিবাসন ইস্যুর সংবাদ কাভারেজ জোরদার করা” (Across seven seas: Strengthening coverage of migrant issues in Sylhet)।

সভায় সিলেটের বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা অংশ নেন এবং শিক্ষার্থী অভিবাসনের বর্তমান বাস্তবতা, তথ্যের ঘাটতি, এবং দায়িত্বশীল রিপোর্টিংয়ের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে মতবিনিময় করেন।

অনুষ্ঠানের সভাপতি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সি-ক্যাবের নির্বাহী পরিচালক জনাব জেইন মাহমুদ। তিনি বলেন, সঠিক ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্তকে অভিবাসন প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে। শিক্ষার্থীরা যেন তথ্যের অভাবে বা ভুল তথ্যের কারণে ভোগান্তিতে না পড়ে তা নিশ্চিত করার কথাও বলেন তিনি। তিনি জানান, ভুল তথ্য, গুজব, এবং অনৈতিক দালালচক্রের কারণে অনেক শিক্ষার্থী ডিপোর্টেশন, আর্থিক ক্ষতি ও মানসিক ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী ও তথ্যভিত্তিক রিপোর্টিং তরুণদের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এজেন্সি প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, “এজেন্সিগুলোর ভালো ও খারাপ আচরণ—দুটোরই উদাহরণ আছে। সব এজেন্সি খারাপ নয়; তাই বাস্তব কেস স্টাডি তুলে ধরা জরুরি। অধিকাংশক্ষেত্রেই ভুল হলে তারা কোনো দায় নেয় না, অথচ শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছানোর সময় তারা অত্যন্ত প্রভাবশালী ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে কথা বলে।“ সিলেটের মানুষের বিদেশযাত্রার প্রবণতার ইতিহাস প্রসঙ্গে সিলেটের নাবিকদের সমুদ্রযাত্রা থেকেই যে এই বিদেশযাত্রার প্রবণতার শুরু, সেটাও উল্লেখ করেন তিনি।

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আইডিয়ার নির্বাহী পরিচালক জনাব নাজমুল হক। তিনি বলেন, তিনি অদক্ষ বা দক্ষতাহীন অভিবাসন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং বলেন, “আমরা অনেক সময় নিজের যোগ্যতা, দক্ষতা বা সক্ষমতা বিবেচনা না করেই বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই, যা পরবর্তীতে নানা ধরনের সমস্যার সৃষ্টি করে।“ এ প্রসঙ্গে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আর গুরুত্ব দেয়ার আহবান জানান। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. তানজিনা চৌধুরী শিক্ষার্থী অভিবাসনের সামাজিক প্রভাব ও তথ্য বিভ্রান্তির ঝুঁকি নিয়ে বলেন, “অনেক সময় আত্মীয়স্বজনও বিদেশে নিয়ে যাওয়ার জন্য উৎসাহ দেন, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি বা সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে ভাবেন না।

আবার, তরুণদের মধ্যে দেখা যায়, যেভাবেই হোক বিদেশে যাওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা, যা অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়। বিদেশে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত দক্ষতা—যেমন স্পোকেন ইংরেজি বা আইইএলটিএসে উচ্চ ব্যান্ড স্কোর—এসবের গুরুত্ব অনেকেই অবমূল্যায়ন করে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। মুক্ত আলোচনা পর্বে সাংবাদিকরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন- “বিদেশে যাওয়া এখন চরম সামাজিক মর্যাদা ও ‘ভালো জীবন’-এর প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই শুধু পাউন্ডে আয় করার আকর্ষণে সিদ্ধান্ত নেন। গ্রামাঞ্চলের অনেক তরুণ আসলে শিক্ষার্থী নন, তবুও শিক্ষার্থী ভিসায় যুক্তরাজ্যে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তারা আরো বলেন, “শুধু এজেন্সিকে দোষ দিলে হবে না—সিলেটের অভিবাসনমুখী মানসিকতা শিক্ষার পরিবেশকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।“ তারা বলেন, ঢাকার পত্রিকাগুলো সিলেটি সংস্কৃতির প্রেক্ষাপট সবসময় তুলে ধরতে পারে না, তাই সিলেটের স্থানীয় গণমাধ্যমকে আরও সক্রিয় হতে হবে। এসময় কন্ট্রাক্ট ম্যারেজ বা ভুয়া বিয়ের মাধ্যমে ভিসা নেওয়ার সমস্যাও আলোচনায় আসে।

অংশগ্রহণকারীরা বলেন, উচ্চশিক্ষার জন্য যারা বিদেশে যায়, তাদের মধ্যে কতজন আসলে পড়াশোনা শেষ করে—এই পরিসংখ্যান সরকারিভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। সি-ক্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রতিষ্ঠানটি অভিবাসন বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যার মধ্যে সচেতনতামূলক ভিডিও তৈরী, বাস্তব অভিজ্ঞতার টেস্টিমোনিয়াল, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য তথ্যভিত্তিক গাইড, কমিউনিটি আউটরিচ, সাংবাদিকদের সাথে যৌথ উদ্যোগ অন্যতম।