আপাসেন নিয়ে সংবাদ সম্মেলন:  সিইও-এর পদত্যাগ, ফরেনসিক তদন্ত ও ট্রাস্টি বোর্ড পুনর্গঠনে চারিটি কমিশনের হস্তক্ষেপ দাবি

আপাসেন নিয়ে সংবাদ সম্মেলন:  সিইও-এর পদত্যাগ, ফরেনসিক তদন্ত ও ট্রাস্টি বোর্ড পুনর্গঠনে চারিটি কমিশনের হস্তক্ষেপ দাবি

 £৬২ মিলিয়ন পাউন্ড কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হয়েছে, তারও চুলচেরা তদন্ত দরকার 

 এসিস্ট্যান্ট ডাইরেক্টর, ডে কেয়ার ম্যানেজার ও হোম কেয়ার ম্যানেজার সহ ১০ জন অভিজ্ঞ কর্মকর্তা কেন আপাসেন ছাড়লেন? 

লন্ডন ১৬ ফেব্রুয়ারি: টাওয়ার হেমলেটসে দীর্ঘদিন ধরে কেয়ার সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান আপাসেন (Apasen)–কে ঘিরে 
নানা বিতর্ক ও প্রশ্নের প্রেক্ষিতে এক সংবাদ সম্মেলনে এর চুড়ান্ত সমাধান আশা করা হয়েছে। লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে আপাসেনের সিইও-এর পদত্যাগ, পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক তদন্ত এবং ট্রাস্টি বোর্ড পুনর্গঠনের জন্য চারিটি কমিশনের হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে ২০১৭ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে আপাসেন-এর সঙ্গে চুক্তির ব্যয় £৫ মিলিয়ন থেকে বেড়ে £৬২ মিলিয়নে পৌঁছানোর প্রেক্ষাপটে “£৬২ মিলিয়ন পাউন্ড কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হয়েছে”—তারও “পূর্ণাঙ্গ ও চুলচেরা তদন্ত” চাওয়া হয়েছে। এছাড়া এসিস্ট্যান্ট ডাইরেক্টর, ডে কেয়ার ম্যানেজার ও হোম কেয়ার ম্যানেজারসহ “১০ জন সিনিয়র ম্যানেজার ও পরিচালক” অল্প সময়ে কেন প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করেছেন—সেই প্রশ্নেরও উত্তর জানতে চাওয়া হয়।

অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য রাখেন, ১৮ বছর Apasen-এ কাজের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন সাবেক সিনিয়র ম্যানেজার জাকির পারভেজ। অংশ নেন, আপাসেন কেয়ার ওয়ার্কার ও টাওয়ার হেমলেটস কেয়ার ওয়ার্কার অর্গানাইজেশন প্রেসিডেন্ট আব্দুল মান্নান, সেক্রেটারি আমির উদ্দিন, ভাইস প্রেসিডেন্ট হাবিবুর রহমান এবং Apasen-এর কেয়ার ওয়ার্কার আবদুল মুমিত চৌধুরী ও আনসার আহমেদ।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে কমিউনিটিতে আপাসেন-এর কিছু কেয়ার ওয়ার্কারের মাধ্যমে র‍্যালী ও সমাবেশ দেখা গেলেও অনেকেই হয়তো জানেন না প্রতিষ্ঠানের ভেতরে প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছে। বিভিন্ন পর্যায়ে কেন অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে এবং কেন সিনিয়র ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করেছেন — সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা কমিউনিটি ও কেয়ার কর্মীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একটি স্বাধীন তদন্ত ইতোমধ্যেই হয়েছে; তাই সংশ্লিষ্ট সকলের প্রকৃত তথ্য জানার অধিকার রয়েছে। তখন হয়তো তাঁরা টাউন হলে মিছিল না করে সরাসরি সিইও বা ট্রাস্টি বোর্ডের কাছে জবাবদিহি চাইবেন

লিখিত বিবৃতিতে বলা হয়, আপাসেন একটি চ‍্যারিটি (Charity) প্রতিষ্ঠান, যা ১৯৮৪ সালে কার্যক্রম শুরু করে এবং সরকারি তথা কাউন্সিলের অর্থায়নে পরিচালিত। তবে প্রতিষ্ঠানটির “পরিচালনা ও নেতৃত্ব” নিয়ে যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে, তা “জনস্বার্থের একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়” হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, “অসহায় ও অসুস্থ বাসিন্দাদের সুরক্ষা, সরকারি তহবিলের যথাযথ ব্যবহার এবং কেয়ার কর্মীদের চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে” একটি “স্বচ্ছ, স্বাধীন ও আরো গভীর ফরেনসিক তদন্ত” জরুরি।

বক্তারা দাবি করেন, কেয়ার কর্মীরা বর্তমানে যে “চাকরির অনিশ্চয়তার” মধ্যে রয়েছেন, তা কাউন্সিলের “চূড়ান্ত পদক্ষেপ” এবং বিশেষ করে চারিটি কমিশনের “হস্তক্ষেপের মাধ্যমে” সমাধান হতে পারে। তাঁদের মতে, এতে “স্বচ্ছতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা” নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।

বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, কয়েক মাস আগে “বিভিন্ন অসঙ্গতির কারণে” অল্প সময়ের মধ্যে “১০ জন সিনিয়র ম্যানেজার ও পরিচালকসহ” একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের চাকরির মেয়াদ ছিল “১৫–২৫ বছরেরও বেশি।” এছাড়া “অনেকে আইনি চুক্তিবদ্ধ থাকায় প্রকাশ্যে কথা বলতে পারছেন না”—এ কথাও বলা হয়। ফলে, “নেপথ্যের প্রকৃত তথ্য কমিউনিটি জানতে পারছে না” বলে দাবি করা হয়।

অভিযোগ করে বলা হয়, বর্তমান সিইও-এর পরে প্রতিষ্ঠানের তিনজন উচ্চপদস্থ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তা ছিলেন এসিস্ট্যান্ট ডাইরেক্টর, ডে কেয়ার ম্যানেজার ও হোম কেয়ার ম্যানেজার। তাদের কে কেন আপাসেন ছাড়তে হয়? এর আগে ফাইন্যান্স ম্যানেজার হঠাৎ কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করেন। তাঁদেরসহ বহু কর্মীর প্রতিষ্ঠান ত্যাগের ফলে সেবার ধারাবাহিকতা, কর্মপরিবেশ ও অভ্যন্তরীণ পরিচালনার ওপর কোনো প্রভাব পড়েছে কিনা — তা খতিয়ে দেখা সোশ্যাল সার্ভিসের জন্য জরুরি বলে তারা মনে করেন।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, “২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে আপাসেন-এর সিইও-এর বিরুদ্ধে একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা হলে তা অভ্যন্তরীণভাবে কৌশলে নিষ্পত্তি করা হয়।” এরপর “বেনামি একটি ই-মেলে সিইও-এর বিরুদ্ধে তথ‍্য প্রকাশ” হওয়ার প্রেক্ষাপটে “একজন এসিসটেন্ট ডিরেক্টর পর্যায়ের কর্মকর্তাসহ তিনজন সিনিয়র ম্যানেজারকে সাময়িক বরখাস্ত” করা হয় বলে জানানো হয়।

পরবর্তীতে “প্রায় ৫০ জন কর্মী সম্মিলিতভাবে” লন্ডন বারা অব টাওয়ার হেমলেটস (LBTH), কেয়ার কোয়ালিটি কমিশন (CQC) এবং চারিটি কমিশনে চিঠি পাঠান বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। সেখানে তাঁরা প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং “দীর্ঘদিন কর্মরত সিনিয়র কর্মকর্তাদের পদত্যাগের আসল কারন নিয়ে তদন্ত দাবি করেন।”

পি ডব্লিউ সি-এর স্বাধীন তদন্ত:

পি ডব্লিউ সি-এর স্বাধীন তদন্ত প্রসঙ্গে বিবৃতিতে বলা হয়, “২০২৪ সালের জানুয়ারিতে” হুইসেলব্লোয়িং-এর মাধ্যমে উত্থাপিত অভিযোগের পর টাওয়ার হেমলেটস কাউন্সিল পি ডব্লিউ সি-কে একটি স্বাধীন তদন্তের দায়িত্ব দেয়। “২০২৪ সালের মে মাসে” কাউন্সিল প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৭ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে পূর্ববর্তী প্রশাসনের সময়ে আপাসেন-এর সঙ্গে চুক্তির ব্যয় £৫ মিলিয়ন থেকে বেড়ে £৬২ মিলিয়নে পৌঁছায়। এ প্রেক্ষাপটে বক্তারা বলেন, “এই £৬২ মিলিয়ন কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হয়েছে”—তার ওপর “পূর্ণাঙ্গ ও চুলচেরা তদন্ত” পরিচালনা করা হোক। কারণ, তদন্ত রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে:
“আপাসেনে শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অভাবে জালিয়াতি ও ভুলত্রুটির ঝুঁকি বেড়ে গেছে।”

আইনি নথি জাল ও 
তারিখ পরিবর্তন: 
আইনি নথি জাল ও তারিখ পরিবর্তন প্রসঙ্গে বিবৃতিতে বলা হয়, স্বাধীন তদন্তে “Falsifying and Backdating Legal Documentation–এর ঘটনাও উঠে এসেছে।” সেখানে উল্লেখ করা হয়, “একজন সিনিয়র কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ নথি জাল ও ব্যাকডেট করার জন্য চাপের মুখে পড়েছিলেন।” তৎকালীন Apasen চেয়ারপারসন উদ্বেগ প্রকাশ করলেও বিষয়টি যথাযথভাবে তদন্ত না হয়ে “তাঁকেই কৌশলে অপসারণ করা হয়,” যদিও তিনি এমন নথিতে “স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানান।”

বক্তারা জানান, “চলমান বা ভবিষ্যৎ তদন্তের স্বাধীনতা, সততা ও জনআস্থা বজায় রাখার স্বার্থে” তাঁদের আহ্বান—“এ বিষয়ে একটি পূর্ণ ফরেনসিক তদন্ত পরিচালনা করা হোক এবং কাউন্সিলের সঙ্গে ফান্ডিং সংক্রান্ত অমীমাংসিত পরিস্থিতির সমাধান না হওয়া পর্যন্ত সিইও-এর পদত্যাগ ও ট্রাস্টি বোর্ড পুনর্গঠনের জন্য চারিটি কমিশনের হস্তক্ষেপ” নিশ্চিত করা হোক। 
এ দাবির পক্ষে তাঁরা তদন্ত রিপোর্টের উদ্ধৃতি তুলে ধরেন:  “ আপাসেনের ভেতরে গভর্নেন্স এবং কন্ট্রোল (পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা) সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি ইস্যু চিহ্নিত করেছে… ট্রাস্টি পর্যায়ে বোর্ডের গঠন নিয়ে ভাবার প্রয়োজন আছে… কারণ, ‘ট্রাস্টিরা কোম্পানিতে নিয়োগপ্রাপ্ত অফিসারদের প্রভাব থেকে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হতে পারেন।’”

এছাড়া তাঁরা চারিটি কমিশনের কাছে Apasen-এর ট্রাস্টি বোর্ডের কার্যক্রমের ওপরও তদন্তের দাবি জানান। কারণ, রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে:
“আমরা আপাসেনে বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দুর্বলতা চিহ্নিত করেছি, যার মধ্যে বোর্ড অব ট্রাস্টিজের ওপর সিইও-এর সরাসরি প্রভাব বিস্তারের বিষয়টিও রয়েছে।”

কেয়ার কর্মীদে স্বার্থ: 
কেয়ার কর্মীদের বিষয়ে বক্তারা বলেন, তাঁরা কেয়ার কর্মীদের প্রতি “পূর্ণ সম্মান ও সংহতি” প্রকাশ করছেন এবং তাঁদের “চাকরির নিরাপত্তা ও মর্যাদা” নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার বলে উল্লেখ করেন । বিবৃতিতে বলা হয়, “সাধারণ কেয়ারারদের উদ্যোগে ৪ দশক আগে Apasen প্রতিষ্ঠিত হয়” এবং বর্তমানে টাওয়ার হ‍্যামলটসে “প্রায় ৪০০ কেয়ার কর্মী” কাজ করছেন। “আজ তাঁরা অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন এবং পুরো প্রতিষ্ঠান ঝুঁকির মুখে”—এমন মন্তব্য করে বক্তারা “দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা” এবং “সাধারণ কেয়ার কর্মীদের কাজের নিশ্চয়তা” কামনা করেন।

অবশ্য তারা  সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, কাউন্সিল জানিয়েছে — তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হলো সেবার ওপর নির্ভরশীল বাসিন্দাদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং ফ্রন্টলাইন কর্মীদের কর্মসংস্থান বজায় রাখা। এই প্রতিশ্রুতিরও বাস্তবায়ন দেখতে চান তারা । 

শেষে বিবৃতিতে বলা হয়, এই বিবৃতি
 “জনস্বার্থে, সৎ বিশ্বাসে এবং প্রকাশিত তদন্ত রিপোর্টের তথ্যের ভিত্তিতে” প্রদান করা হয়েছে এবং যুক্তরাজ্যের Public Interest Disclosure Act 1998 ও Defamation Act 2013-এ স্বীকৃত জনস্বার্থ নীতির আলোকে করা হয়েছে।