নিরবেই প্রস্থান জীবন্ত কিংবদন্তী বশর চৌধুরীর

নিরবেই প্রস্থান জীবন্ত কিংবদন্তী বশর চৌধুরীর


মো.ফয়ছল আলম:
নিরবেই চলে গেলেন সিলেটের এক বরেণ্য কিংবদন্তী। আবুল বশর ছদরুল উল্লা চৌধুরী নামের এই গুণীজন গত বুধবার বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে তিনি নগরের ইবনে সিনা হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন। তিনি তিন ছেলে এক মেয়ে স্ত্রীসহ অসংখ্য আত্মীয় স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিলো ৯৫ বছর। গতকাল বৃহষ্পতিবার বাদ জোহর কানিশাইল ঈদগাহ ময়দানে জানাজা শেষে তাঁকে দাফন করা হয়। সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার ঢাকাদক্ষিন ইউনিয়নের কানিশাইল গ্রামে জন্ম নেয়া বশর চৌধূরী বুয়েট থেকে লেখাপড়া শেষ করে এলাকায় এসে মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি সেই ব্রত নিয়েই চলেছেন। ২০২০ সালে বাংলাভাষী’তে তাঁর একটি সাক্ষাতকার প্রকাশিত হয়। পাঠকদের জন্য সেটি তুলে ধরা হলো।
বর্ণাঢ্য জীবন:
বশর মিয়া,বশর চৌধুরী,আবুল বশর মোহাম্মদ ছদরুল উলা চৌধুরী। যে নামেই  ডাকুন বা চিনুন, তিনি সেই  ব্যক্তি যিনি জীবনের শুরু থেকে পুরোটা সময় দেশ মাটি আর মানুষের জন্য কাজ করেছেন। বলতে গেলে সমাজের জন্য উৎসর্গ করা ছিলো তার পুরো জীবন। যশ খ্যাতি কিংবা উচ্চ পদ কখনোই চাননি। নিজগ্রাম কানিশাইল থেকে ঢাকা বুয়েট পর্যন্ত যার পদচিহ্ন রয়েছে। রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা আন্দোলনের সম্পৃক্ততা। বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী আবুল বশর মোহাম্মদ ছদরুল উলা চৌধুরীর অনেক সঙ্গী-সাথী দেশের বাঘা বাঘা রাজনৈতিক নেতা হয়ে ছেন,মন্ত্রী হয়েছেন কিন্ত বশর চৌধুরী এক ভাগ্য বিড়ম্বিত মানুষ। যার মেধা যোগ্যতা,পারিবারিক অবস্থান সব কিছু থাকার পরও রয়ে গেছেন লোক চক্ষুর অন্তরালে। দেশের অনেক গুণী মানুষ যখন একুশে পদক পান,স্বাধীনতা পদক পান তখন যিনি বলেন, ও , সে তো আমার ক্লাস মেইট, ওর সঙ্গেতো এক হোস্টেলে ছিলাম। উনার সঙ্গেতো আন্দোলন করেছি। কিন্তু প্রথিতযশা  এই রাজনীতিবিদ শুধুই একটি পরিচয় বহন করছেন,সেটি হলো আওয়ামীলীগের বশর মিয়া। রাজনীতি আর সমাজসেবার মহান ব্রত নিয়েই জীবনের শেষ দিনগুলো বাড়িতেই  কেটেছে সহধর্মিনীর সঙ্গে।
পরিবার: কেমন আছেন এ গুণী ব্যক্তিত্ব সে খবর নিতে ২০২০  গিয়েছিলাম তাঁর বাড়িতে। গোলাপগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ঢাকাদক্ষিণ ইউনিয়নের কানিশাইল গ্রামে তাঁর পৈত্রিক নিবাস। সেখানে জন্ম,বেড়ে উঠা,শৈশব কৈশোর সব। ১৯৩৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারী তাঁর জন্ম। গ্রামের মরহুম মাহমুদ বখত চৌধুরী এবং ফয়জুন্নেছা চৌধুরীর তিনপুত্র এক কন্যার মধ্যে তিনি অন্যতম। স্ত্রী জুবেদা খানম চ্যেধুরী,পুত্র নওশাদ মাহমুদ সাদি চৌধুরী,শসমাদ মাহমুদ ওমর চৌধুরী আর একমাত্র কন্যা রুমানা মাহমুদ দিলশাদ চৌধুরীকে নিয়ে তাঁর সংসার। দুই ছেলে ঢাকায় দুটি বেসরকারী কোম্পানীতে চাকুরী করেন।
শিক্ষাজীবন: 
বশর চৌধুরীর শিক্ষাজীবন শুরু নিজ ইউনিয়নের দত্তরাইল এম ই স্কুলে। ১৯৪৪ সালে সেখান থেকে সিক্স পাশ করেন। এরপর কিছুদিন ভাদেশ্বর নাসির উদ্দিন হাইস্কুল এবং ভারতের করিমগঞ্জে কিছুদিন লেখাপড়া করেন। এরপর ১৯৪৭ সালে ভর্তি হন সিলেট পাইলট হাইস্কুলে। সেখান থেকে ১৯৪৯সালে মেট্টিক পাশ;করেন। এরপর ভতি হন সিলেট এমসি কলেজে। সেখান থেকে ১৯৫২ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে ভর্তি হন ঢাকাস্থ আহসান উল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে। যেটি বর্তমানে বুয়েট হিসেবে পরিচিত। এমসি কলেজে থাকাকালীনই ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন। ১৯৫২ সালে যখন ভাষা আন্দোলন তুঙ্গে তখন ঢাকায় আহসান উল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজেও  আন্দোলনের হাওয়া লাগে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক যে আন্দোলন হতো সে আন্দোলনে সম্পৃক্ত হতেন বড় বড় সবকটি শিক্ষা প্রতিষ্টানের শিখাষার্থীরা সম্পৃক্ত থাকতেন। সে হিসেবে বশর চৌধুরীও নেতৃত্ব দিতেন তাঁর কলেজের শিক্ষার্থীদের পক্ষে।। তাঁর সম্পৃক্ততার অন্যতম কারণ ছিলো আহসান উল্লায় ভর্তি হয়েই তিনি “নেতা” হয়ে উঠেন। কারণ সে সময় তিনি ছিলেন বিভিন্ন দায়িত্বে। তিনি অ্যাথলেটিক্স ক্লাব  ও টেনিস ক্লাবের সেক্রেটারী হন। ১৯৫৩-৫৪সালে তিনি অ্যাথলেটিক্স ক্লাবের জেনারেল সেক্রেটারী ছিলেন। যখন নুরুল আমিন মিনিষ্টার ছিলেন তখন ঢাকায় কালো পতাকা মিছিল ও তাকে নিষিদ্ধ ঘৈাষণার আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিলেন। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত,বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্ণর ড: ফরাস         উদ্দিন,সাবেক শিক্ষা সচিব হেদায়েত আহমদ, শাবিপ্রবির সাবেক ভিসি ড, ছদরুদ্দিন চৌধুরী, ইটিভি চেয়ারম্যান আবু সাইদ আহমদ প্রাক্তন কর্মকর্তা গোলাম আকবরসহ ৮৪ জনের একজন ছিলেন বশর চৌধুরী। 
ঢাকাস্থ জালালাবাদ স্টুডেন্ট এসোসিয়েশন নামের যে সংগঠন রয়েছে সেটির প্রতিষ্টাতাদের একজন বশর চৌধুরী। তাকে আহবায়ক করে গঠিত প্রথম কমিটিতে সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত ছিলেন সদস্য সচিব। সেই ছাত্রনেতাদের জীবনপথ একপথে চললেও বশর চৌধুরীর হয়েছে উল্টোগতি। তারা হয়েছেন দেশের কাছে সেলিব্রেটি। আর বশর চৌধুরী হয়েছেন এলাকার মানুষের কাছে সেলিব্রেটি। জীবনের নয়টি দশক পার করেছেন, সমাজ আর দলকে শুধুই দিয়েছেন,নেননি কিছু। একবার ঢাকাদক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আর এক দশক আওয়ামীলীগের ঢাকাদক্ষিণ ইউনিয়ন সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। স্থানীয় ঢাকাদক্ষিণ বহুমুখি উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের সভাপতি ছিলেন। ছিলেন ঢাকাদক্ষিণ ডিগ্রী কলেজ গভর্নিং বডির সদস্য ছিলেন। আর এসবই অর্জন করেছেন নিজের মর্যাদা বলে। দল কিংবা রাষ্ট্র থেকে কিছুই পাননি তিনি। স্থানীয় লোকজন বলেন বশর চৌধুরীর জীবনটাই মানুষের জন্য উৎসর্গ করা। 
উৎসর্গ করা বশর চৌধুরী শিখেছেন পরিবার থেকে। সে কারণে আহসান উল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় তিনি ছিলেন এক জাদরেল প্রতিবাদী ছাত্রনেতা। তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আপোষ না করায় বশর চৌধুরী শেষ পর্যন্ত তাঁর ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সটা পর্যন্ত সম্পন্ন করতে পারেননি। কলেজের তৎকালীন সুপারিনটেনডেন্ট আর কতিপয় নিকটজনের বিমাতা সুলভ আচরণ সে পথে বাধা হয়ে দাড়িয়েছিলো বলে বশর চৌধুরী নিজেই বললেন। লেখাপড়ার পাঠ অসমাপ্ত করেই  বাড়ি ফিরতে হয় বশর চৌধুরীকে। 
তবু বশর চৌধুরী এক উদার মনের মানুষ। যিনি কোনোদিন কারো বিরুদ্ধে কথা বলেননি। বরং যে  সুপারিনটেনডেন্ট এর কারণে তার শিক্ষা জীবন বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে,তাকে মর্যাদা দেয়ার জন্য তিনি লড়েছেন বড়দের সঙ্গে।  সিলেটের কৃতী সন্তান গিয়াসুদ্দিন আহমদকে যখন ঢাকায় সিলেটীরা প্রথম সংবর্ধনা দিতে উদ্যোগী হন,তখন বশর চৌধুরী ছিলেন সে কমিটিতে ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে। তিনি সে সময় প্রতিবাদ জানিয়ে   বলেন,আমাদের কলেজের প্রিন্সিপাল রশীদ উদ্দিনওতো সিলেটের সন্তান। তিনি প্রিন্সিপাল হয়েছেন,তাকেও সংবর্ধনা দেয়া হোক। ফলে তখন দুজনকেই  ঢাকায় সিলেটী অফিসার হিসেবে সংবর্ধনা দেয়া হয়। এরপর ঢাকায় জালালাবাদ এসোসিয়েশন গঠন হয়। সেখানেও তিনি ছিলেন।
  সৌভাগ্য হোক আর দুর্ভাগ্যবশত হোক বশর চৌধুরী শিক্ষাজীবন শেষে নিজ এলাকায় ফিরে আসেন। কিছুদিন ভাদেশ্বর নাছির উদ্দিন হাইস্কুলে এবং পরবতীতে ঢাকাদক্ষিণ বহুমুখি উচ্চ বিদ্যালয়ে এলাকাবাসীর অনুরোধে শিক্ষকতা করেন। এরপর কিছুদিন বেসরকারী চাকুরীও করেন। সবশেষ এলাকার মানুষের সঙ্গে মিশে যান “উচ্চ শিক্ষিত” বশর চৌধুরী। নিজ এলাকার শিক্ষা বিস্তার,শিক্ষা প্রতিষ্টানের উন্নয়ন সহ নানা সেবামুলক কাজে মনোনিবেশ করেন,আর নিজের অজান্তেই  হারিয়ে যান সাধারণ মানুষের ভিড়ে। তখন সে ভিড়ে মানুষ তাকে পায় একজন অভিভাবক     হিসেবে,পান একজন নিভৃতচারী সমাজসেবী হিসেবে। আর এরই মাঝে জীবনের সুখ নেন সাধারণ মানুষের প্রিয় “বশর মিয়া”।
এলাকার জন্য কি কি করেছেন-এ প্রশ্ন করতেই বললেন,আমার জীবনটাইতো ঢাকাদক্ষিনের জন্য উৎসর্গ করে দিলাম। আর সে সবের বর্ণণা দিতে গিয়ে তিনি বললেন, কোথায় আমি নেই, আমার অবদান নেই। সবখানেই নিজের সাধ্যমত চেষ্টা করেছি কাজ করার। আর বাকী জীবনটাও মানুষের পাশে থেকে কাটিয়ে দিতে চাই।