সংখ্যার ইসলাম না চরিত্রের ইসলাম

সংখ্যার ইসলাম না চরিত্রের ইসলাম



বহির্বিশ্বে মুসলমানদের সংখ্যা আজ প্রায় ২.২৮ বিলিয়ন। ইসলাম বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্ম। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়– এই বিপুল সংখ্যার ভেতর প্রকৃত মুমিনের সংখ্যা কতজন?
বাস্তবতা হলো, মুসলিম বিশ্বের বড় সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্র প্রাচ্য–পাশ্চাত্যের ক্ষমতাধর সরকার গুলোর আনুগত্যে করে বিলাসী জীবনযাপন করছে। অন্যদিকে যারা সেই আনুগত্য অস্বীকার কিংবা অসম্মতি জানাচ্ছে, তারা দুর্বিষহ জীবন, অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা ও নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। মুসলমান রাষ্ট্রগুলোর ভেতরেও আজ ঈমান, আকিদা ও ইনসাফের কথা বলা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে। সত্য উচ্চারণ যেন অপরাধে পরিণত হয়েছে। এই প্রসঙ্গে রাসূলে করীম ﷺ–এর একটি হাদিস বারবার মনে পড়ে যায়। 
নবী করীম ﷺ  তিনি বলেছেন—কিয়ামতের আগে এমন এক সময় আসবে, যখন ইমানের ওপর অটল থাকা হবে জ্বলন্ত অঙ্গার হাতে ধরে রাখার মতোই কঠিন।
সঙ্গত কারণে প্রশ্ন আসে তাহলে কি আমরা সেই সীমানার একেবারেই দ্বারপ্রান্তে? 
একটু গভীরে তাকালে দেখা যায়– আলেম সমাজ থেকে শুরু করে সমাজের প্রায় প্রতিটি স্তরেই ইসলামকে ধীরে ধীরে একটি ব্যবসায়িক পণ্যে রূপান্তর করা হয়েছে। দ্বীন আর দাওয়াতের জায়গায় ঢুকে পড়েছে লাভ-লোকসানের হিসাব, তাকওয়ার জায়গায় এসেছে সুবিধাবাদিতা।
অথচ আল্লাহ তাআলা কুরআনে সুস্পষ্টভাবে সতর্ক করে দিয়েছেন—
“ওয়ালা তাশতারু বিআয়াতি সামানান কালিলা”
অর্থাৎ, তোমরা আমার আয়াতসমূহকে সস্তা দামে বিক্রি করো না। সূরা আল-বাকারা (২:৪১)
নবী করীম ﷺ একটি হাদিসে শেষ জামানার এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছেন—তিনি বলেছেন, এমন এক সময় আসবে যখন মসজিদ মুসল্লিতে ভরে যাবে, অথচ কারও নামাজ কবুল হবে না। সাহাবারা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তাহলে ইমাম সাহেবের কী অবস্থা হবে?” রসুলে পাক ﷺ গভীর আফসোসের সঙ্গে উত্তর দিলেন—“ইমাম সাহেবও তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।”
এই হাদিস আজ আমাদের সামনে আয়নার মতো দাঁড়িয়ে আছে। ইউরোপ ও আমেরিকার দিকে তাকালে অনেক সময় ভয় হয়—মনে হয় আমরা কি তবে সেই স্তরেই পৌঁছে গেছি? মসজিদ আছে, মুসল্লিও আছে, কিন্তু আত্মা কোথায়? ইবাদতের চেয়ে হিসাব বেশি, তাকওয়ার চেয়ে তহবিলের আলোচনা বেশি।
আজ প্রতিটি মসজিদে চাঁদা সংগ্রহের জন্য ক্রেডিট কার্ড, অ্যাপ, নানা কৌশলে ফান্ড শক্ত করার প্রতিযোগিতা চলছে। “ফান্ডরেইজিং”-এর নামে ডিনারের আয়োজন হচ্ছে, ইবাদতের ঘর যেন ইভেন্ট হলের রূপ নিচ্ছে। কোথাও সরকারি খাস জমি দখল করে, অনুমতি ছাড়াই মসজিদ নির্মাণ করা হচ্ছে—যেখানে হক ও হালালের প্রশ্নই তোলা হচ্ছে না। 
নামাজের ভেতরে ও বাইরে মিলিয়ে মোট ১৩টি ফরজ রয়েছে। এর যেকোনো একটি না হলে নামাজ শুদ্ধ হয় না। যেমন—জামা পাক, শরীর পাক, জায়গা পাক ইত্যাদি। এখানে জায়গা পাক বলতে শুধু মাটি নাপাক না হওয়াই নয়, সেই জায়গার বৈধতাও জরুরি। অবৈধ বা জোরপূর্বক দখলকৃত জায়গায় আদায় করা নামাজও শুদ্ধ হয় না।আরও দুঃখজনক হলো, অনেক মসজিদ কমিটি পরিচালিত হচ্ছে নামাজবিমুখ, চরিত্রহীন ও ক্ষমতালোভী লোকদের দ্বারা। 
কিছু আলেম নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য মাসআলা-মাসায়েলকে নিজেদের মতো করে সাজিয়ে উপস্থাপন করছেন—দ্বীনের সহজীকরণ নয়, বরং সুবিধাবাদিতার ফতোয়া ছড়িয়ে পড়ছে।
মসজিদ‌, মাদ্রাসা এতিমখানা ইত্যাদি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দানের ফজিলত এত বেশি যে বলা হয়—জমিন ও আসমানসম গুনাহ থাকলেও আল্লাহ মাফ করে জান্নাতের বিনা হিসেবে প্রবেশ করাবেন। এই কথাগুলো শুনে মনে প্রশ্ন জাগে—তবে কেন মানুষ জীবনের এতটা কষ্ট সয়ে ত্রিশটি রোযা রাখে? কেন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে নিজেকে বেঁধে রাখে? 
কোরআনের নির্দেশ মানতে গিয়ে মুমিন শাহাদাত বরণ করেন? 
কেন কেউ জেল-জুলুম সহ্য করে, জীবনের সর্বস্ব হারিয়ে ফেলছে?
আফসোস লাগে– বর্তমান “ইসলামি লেভেল”-এর নামে চাঁদাবাজিতে অভ্যস্ত এক শ্রেণির আলেম সমাজ এমন সব ফতোয়া দিচ্ছেন, যা অপরাধ জগতের মানুষকে অপরাধে আরও সাহসী করে তোলে। যেন বার্তা এমন —চুরি, ডাকাতি, জেনা-ব্যভিচার সবই কর; মাঝেমধ্যে মসজিদে এসে মোটা অঙ্কের দান দিলেই সব পাপ ধুয়ে যাবে।
কোরআন বলে হালালান তায়্যেবা, অর্থাৎ পবিত্র ও হালাল জীবিকা অবলম্বন করো। 
অথচ আমরা বাজারে গিয়ে হালাল মাংস খুঁজি, কিন্তু নিজের আয়ের উৎস হালাল কি না, সে খবর রাখি ক’জন? সুদের ওপর ব্যবসা, সুদের টাকায় বাড়ি—তারপরও মসজিদের দায়িত্বে বসে থাকা যেন স্বাভাবিক বিষয়। কোথাও শোনা যায়, “থাকার জন্য প্রথম বাড়ি হলে সুদে কেনা যাবে”—ফতোয়ার এমন সহজ রাস্তা।
হজের নামেও গড়ে উঠেছে বিশাল ব্যবসা—ইসলামের অর্গানাইজেশনের ছায়ায়, লেভেলের পর লেভেল দ্বারা ইউরোপ আমেরিকা সহ বিশ্বের সর্বত্র টপ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে লাভের হিসাব। ধর্ম তখন ইবাদত থাকে না, হয়ে ওঠে প্যাকেজ; তাকওয়া নয়, প্রাধান্য পায় লেনদেন।

আমাদের সমাজে ধীরে ধীরে একটি সহজ ধারণা গড়ে উঠেছে—মুমিন হতে হলে লম্বা দাড়ি রাখতে হবে, পাঞ্জাবি পরতে হবে, মিসওয়াক ব্যবহার করতে হবে, খতনা দিতে হবে, হাতে তসবি নিতে হবে, হজ্জ করে এসে হাজী নাম লিখতে হবে, মসজিদ মাদ্রাসায় প্রকাশ্যে দান করতে হবে, আর নামের আগে ‘মোহাম্মদ’ যোগ করলেই যেন পাক্কা মোমিন হওয়া যায়। 
বাস্তবতা কিন্তু এতটা সরল নয়।
এগুলো ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় ও বাহ্যিক আমল হতে পারে, তবে এগুলো দিয়ে বড়জোর একজন মানুষ নিজেকে আবদুল মুমিন—অর্থাৎ মুমিন হওয়ার পথে একজন দাবিদার হিসেবে দাঁড় করাতে পারে। প্রকৃত অর্থে মুমিন হওয়া কেবল পোশাক, নাম বা বাহ্যিক অনুশীলনের বিষয় নয়; এটি চরিত্র, নৈতিকতা ও জীবনাচরণের গভীর রূপান্তরের নাম।
জগত বিখ্যাত মুফাসসিরগন কোরআন থেকে মুমিনের অন্তত ৩০টি গুণের কথা উল্লেখ করেছেন নিম্নে উল্লেখিত এই গুণগুলো যাদের মধ্যে আছে তারাই হচ্ছে প্রকৃত মুমিন।
সূরা তওবা দশটি সুরা মুমিনের দশটি, এবং সূরা আহযাবে দশটি।
সূরা তাওবা,
তারা তওবাকারী, এবাদতকারী, শোকরগোযার, 
সম্পর্কচ্ছেদকারী, (দুনিয়ার সাথে),রুকু ও সিজদা আদায়কারী, সৎকাজের আদেশ দানকারী ও 
মন্দ কাজ থেকে নিবৃতকারী এবং 
আল্লাহর দেওয়া সীমাসমূহের হেফাযতকারী। বস্তুতঃ সুসংবাদ দাও ঈমানদারদেরকে।
সূরা আহযাব
নিশ্চয় মুসলমান পুরুষ, মুসলমান নারী, ঈমানদার পুরুষ, ঈমানদার নারী, অনুগত পুরুষ, অনুগত নারী, সত্যবাদী পুরুষ, সত্যবাদী নারী, ধৈর্য্যশীল পুরুষ, ধৈর্য্যশীল নারী, বিনীত পুরুষ, বিনীত নারী, দানশীল পুরুষ, দানশীল নারী, রোযা পালণকারী পুরুষ, রোযা পালনকারী নারী, যৌনাঙ্গ হেফাযতকারী পুরুষ, যৌনাঙ্গ হেফাযতকারী নারী, আল্লাহর অধিক যিকরকারী পুরুষ ও যিকরকারী নারী-
অনুরূপভাবে সূরা মুমিনের এক থেকে দশ নম্বর আয়াতে বর্ণনা আছে আরও দশটি মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
যে গুণগুলো হৃদয়ের ভেতর গড়ে ওঠে, আচরণে প্রকাশ পায় এবং সমাজে ন্যায় ও কল্যাণের ছাপ ফেলে। এই গুণগুলোর অধিকারী হলে জান্নাতের পথ সহজ হয় বলে কোরআন আমাদের আশ্বাস দেয়। আবার হাদিসে রাসুলুল্লাহ ﷺ মুমিনের আরও প্রায় ৭০টি গুণের বর্ণনা দিয়েছেন, যেখানে ঈমান শুধু ইবাদতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সত্যবাদিতা, আমানতদারি, ন্যায়পরায়ণতা, সংযম ও মানুষের প্রতি দয়া—সবকিছুর সমন্বয়।
অতএব মুমিন হওয়া মানে কেবল বাহ্যিক পরিচয় নয়, বরং ভেতর থেকে আলোকিত হওয়া। নাম, দাড়ি বা পোশাক পরিচয় হতে পারে, কিন্তু মুমিন হওয়ার আসল মাপকাঠি হলো—কোরআন ও সুন্নাহর আলোয় নিজের চরিত্রকে গড়ে তোলা এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সেই আলো ছড়িয়ে দেওয়া।
এই বাস্তবতায় প্রশ্নটা তাই আরও তীব্র হয়ে ওঠে—ইসলাম কি কেবল দানের অঙ্কে মাপা হবে, নাকি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ন্যায়, সততা আর হালালের কঠিন পথে চলার নামই আসল ইসলাম। মূলত মসজিদ ও নামাজের ভিড়ে ঈমান হারাচ্ছে; প্রকৃত মুমিন সেই ব্যক্তি, যিনি কোরআন ও সুন্নাহ অনুসারে চরিত্র, ন্যায় ও সততার মাধ্যমে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আলোকিত।


মিসবাহ উদ্দিন আহমদ 
কলামিস্ট, নিউইয়র্ক